Police station, public duty, service, civic life, and institutional memory.
বাবুই পাখির বাসা
কালবৈশাখী । বাইরে ভীষন ঝড়। অশান্ত প্রবল বৃষ্টি । একটানা মেঘের গর্জন । ঘন কালো ঘুটঘুটে অন্ধকার। যেন প্রলয় চলছে।
রাত এগারোটা। থানায় আজ লোকজন নেই - ফাঁকা। পুলিশ হেফাজতে থাকা দু'জন আসামী গভীর নিদ্রামগ্ন।
আজ একটু উদাসীন লাগছে। কাজ ফেলে
বাসায় চলে এলেম।
থানা থেকে অনতিদূরে, চত্ত্বরের ভিতরেই আমার তিন কামরার সরকারি বাসা। উঁচু প্রাচীর দিয়ে ঘেরা বেশ কিছুটা বাঁধানো উঠান তার এখানে ওখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে বেশকিছু গাছগাছালি ও বড় বড় ফলন্ত কাঁঠাল গাছ। বাসা সংলগ্ন দুটি বারান্দা। একটি ভেতর দিকে অর্থাৎ উঠানের দিকে অপরটি বাহির দিকে চলাচলের রাস্তা সংলগ্ন। রাস্তায় বাহিরের কোন লোক যাতায়াত করেন না। বাহির বারান্দা সংলগ্ন, নিচু প্রাচীর দিয়ে ঘেরা , ছোট্ট ফুলবাগান - সেখানে গোলাপ, রংগন, বেলী ও বিভিন্ন ফুলের গাছ। ঠিক তার উল্টো দিকে বহু গাছপালাসহ প্রাচীন মস্ত এক রাবার গাছ, যা থেকে বড় বড় ঝুরি নেমে এসেছে - সে গাছ যেন অসংখ্য বিভিন্ন ধরনের পাখিদের আশ্রয় - সারাদিন সারারাত কিচিরমিচির - কিচিরমিচির।
রাবার গাছ সংলগ্ন পশ্চিম দিকে দণ্ডায়মান ভগ্নদশা ,পোড়ো, ভুতুড়ে, পলেস্তারা হীন মস্ত এক একতলা বাড়ি। তার দেওয়াল থেকে গজিয়ে উঠেছে বট ও অন্যান্য গাছপালা। তার অসংখ্য জরাজীর্ণ অব্যবহার্য ঘরের মধ্যে মাত্র দুটি ঘরে দুজন পুলিশ অফিসার কোনরকমে মাথা গুজে থাকেন। বাসার পূর্ব দিক দিয়ে বয়ে চলেছে সুদীর্ঘ ইছামতি নদী।
বাসায় ফিরে, বাহির বারান্দায় ইজি চেয়ারে বসলাম। কালবৈশাখীর প্রবল ঝড় ও তার সাথে অবিশ্রান্ত বৃষ্টি হচ্ছে চারিদিকে ঘন ঘুটঘুটে অন্ধকার। হঠাৎ বিদ্যুতের ঝলকানিতে সমস্ত পৃথিবীটাকে এক পলকে দেখা যাচ্ছে, পরক্ষনেই ঘন অন্ধকারে ডুব দিচ্ছে পৃথিবী। আজ একটিও পাখি ডাকছে না রাবার গাছটাতে। কোকিল টাও বাসার মধ্যে চুপ করে আছে। প্রতিদিন সারাটা রাত একটানা কু-উ-উ , কু-উ-উ করে ডেকেই চলে। আজ একেবারে নিশ্চুপ। মনে হয় ও যেন ওর পরিবারের কর্তা। হয়তো বা , এই দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় ভীষণ আশঙ্কিত হয়ে, দুরু দুরু বুকে ভাবছে - যদি নীড় খানি ঝড়ে উড়ে যায়...??
পৃথিবীতে শুধুমাত্র নিজের ছাড়া অন্য কোন জীবের অস্তিত্ব এই মুহূর্তে উপলব্ধ হচ্ছেনা।
পা দুটিকে ভেজাবার জন্য বৃষ্টির ছাটের দিকে একটু এগিয়ে দিলেম ।
ছোটবেলার বাবার কথা মনে পরে গেল।
কালবৈশাখীর প্রবল ঝড়ের মাতন দেখে - আমি যখন আনন্দে আত্মহারা হয়ে উঠতাম। যখন নীরফেরা পাখিগুলি সোজা আকাশ পথে উড়তে পারত না, এলোমেলো ঝড়ের দাপটে কখনো ডানদিকে ,কখনো বাম দিকে ,কখনো উপরে কখনো নিচে অনিচ্ছাকৃত গতিপথ পরিবর্তন করত - দেখে বেশ মজা লাগতো আমার। নাতিদূরত্বে এক জোড়া তালগাছ ছিল , মনের পর্দায় ঐ তালগাছ জুটিকে নিয়ে অনেক ছবি আঁকতাম। কখনো ভাবতাম ওরা সন্তানহীন দম্পতি। গভীর রাতে যে মৃদু ছায়ালোকে অল্পবিস্তর সকল কিছু পরিলক্ষিত হয়, সে রকম কোন রাতে ওই তালগাছ দুটিকে মনে হতো ঘুমন্ত দুই শিশু, পাশাপাশি নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে রয়েছে।
বৈশাখের তপ্ত রোদ্দুরে যখন কেউ বাইরে বের হতো না, তখন ওদের দেখে ভাবতাম ওরা বোধহয় পরিশ্রমী কৃষক যুগল - যাদের শরীর ,জীবন যুদ্ধে সম্পূর্ণত উপেক্ষিত ।
ঐ তালগাছ দুটিতে অসংখ্য বাবুই পাখিরা বাসা বুনতো। মনে হতো ওটা যেন বাবুই পাখিদের সমাজ , ওদের পাড়া। পাশাপাশি ওদের ছোট ছোট ঘর। ওরা নিজেদের আনন্দ-দুঃখ অনুভূতি দেয়া নেয়া করে। ওদের সমাজেও উৎসব আছে , আছে এক নিবিড় বন্ধন। রাত গভীর হলে ওরাও ওদের বাসার দরজা বন্ধ করে সপরিবারে বাস করে রুদ্ধশ্বাসে।
কালবৈশাখী ঝড়ের প্রবল দাপটে যখন সেই বাবুই পাখির বাসা গুলি ভীষণভাবে টিকে থাকার সংগ্রাম করত - আমি অবাক হয়ে চেয়ে থাকতাম.
কি এক অব্যক্ত যন্ত্রণা ও আশঙ্কা আমায় গ্রাস করতো। মনে হতো প্রকৃতির রুদ্ররোষে এই হয়তো প্রলয় এলো - ওদের পাড়ায়। এখনই হয়তো ছারখার হয়ে যাবে ওদের সব স্বপ্ন, সব ভালো লাগা, সব দেওয়া -নেওয়া।
'বাবু ঘরে আয়, বাইরে থাকিস নে' - বাবা ডাকতেন। অনিচ্ছাকৃত ঘরে ঢুকতাম বারান্দা ছেড়ে । তখনও পা দুটি বৃষ্টির জলে ভেজা থাকতো । বাবা সস্নেহে কোলে তুলে নিয়ে
গামছা দিয়ে মুছে দিতেন।।
বাবার গলাটা জড়িয়ে ধরে, তাঁর চোখের দিকে চেয়ে থাকতাম। সে দৃষ্টি যেন লুকোতে চাইত , তাঁর অন্তরে সৃষ্ট এক দুর্ভাবনা ও নিরাপত্তাহীনতার আশঙ্কাকে।
তখন সেই চার দেয়ালে ঘেরা মাটির ঘরটিকে মনে হতো যেন বাবুই পাখির বাসা, ঝড়ের প্রবল দাপটে যেকোনো নিমেষে তা লুটিয়ে পড়তে পারে মাটিতে - হারিয়ে যেতে পারে আগামীর স্বপ্ন।
আজ আমি বুঝি , আমরা সকলেই রচনা করি এক বাবুই পাখির বাসা- আর অসংখ্য স্বপ্ন বুনি তার মাঝে ... কত বাসা নিশ্চিহ্ন হয় ... কত স্বপ্ন ভেঙে খানখান হয় অদৃশ্য কালবৈশাখী ঝড়ে - তার খবর কে রাখে ??
সতীনাথ চট্টোরাজ
বনগাঁ
এক কালবৈশাখীর রাতে, ১৪২৫
Read More of Satinath
Prose meditation
Duty & Public Service
২৩ কার্ত্তিক ১৪২৪Public-service post
এখানেই স্বর্গ
সে দিনটি ছিল মাঘী-পূর্ণিমা। তখন সন্ধ্যা প্রায় উত্তীর্ণ হইয়াছে। থানা হইতে প্রায় আট ক্রোশ দূরে, মাতলা নদীর চরের নির্জন মাঠে আয়োজিত গ্রাম্য ফুটবল টুর্নামেন্টের বিজয়ী দলের স্বীকৃতি স্বরূপ ধাতব নির্মিত মাঝারি মাপের স্মারকটি মহসিনের হাতে তুল...
Nature, River & SeasonsMemory & Childhoodবনগাঁক্যানিং
যখন রাত্রি নামে , যুদ্ধ শেষে ঘরে ফিরে আসি, দেখি প্রবেশদ্বারের ডানদিকে উঠোনের কোণে স্বল্প আলোকে লাজুক আনত ভঙ্গিমায় মাথা হেঁট করে দাড়িয়ে আছে ঝাউ গাছ খানি। যেন সারাদিনের অপেক্ষার অবসান। মনে হয় প্রতিটা জীবনের জন্য অন্তত একটা অপেক্ষা প্রয়োজ...
অপেক্ষা যখন রাত্রি নামে , যুদ্ধ শেষে ঘরে ফিরে আসি, দেখি প্রবেশদ্বারের ডানদিকে উঠোনের কোণে স্বল্প আলোকে লাজুক আনত ভঙ্গিমায় মাথা হেঁট করে দাড়িয়ে আছে ঝাউ গাছ খানি। যেন সারাদিনের অপেক্ষার অবসান। মনে হয় প্রতিটা জীবনের জন্য অন্তত একটা অপেক্ষা...