সতীনাথ চট্টোরাজOpening the archive doors
Writings Archive
Original Bengali text
Duty & Public Service

Police station, public duty, service, civic life, and institutional memory.

এখানেই স্বর্গ

সে দিনটি ছিল মাঘী-পূর্ণিমা। তখন সন্ধ্যা প্রায় উত্তীর্ণ হইয়াছে। থানা হইতে প্রায় আট ক্রোশ দূরে, মাতলা নদীর চরের নির্জন মাঠে আয়োজিত গ্রাম্য ফুটবল টুর্নামেন্টের বিজয়ী দলের স্বীকৃতি স্বরূপ ধাতব নির্মিত মাঝারি মাপের স্মারকটি মহসিনের হাতে তুলিয়া দিলাম। একদল উম্মত্ত যুবক কোলাহল করিতে করিতে, তাহাদের 'ফুটবল-দলের' এক ও একমাত্র কর্মকর্তা মহসিনকে কাঁধের উপর তুলিয়া লইয়া, 'হিপ্- হিপ্- হুররে' চিৎকার করিতে করিতে, বিশ্বজয়ের উল্লাসে নাচিতে নাচিতে , কোথায় যেন মিলাইয়া গেল। আমিও জীপ গাড়িতে চাপিয়া বসিলাম। আট ক্রোশ পথ অতিক্রম করিয়া , যত দ্রুত সম্ভব থানায় পৌঁছাইতে হইবে । কাজের চাপ বড্ড বাড়িয়া গিয়াছে। বড় সাহেব থানা পরিদর্শনে আসিবেন। সুদীর্ঘ আঁকাবাঁকা পথ। দুই পাশেই কেবলমাত্র ধানক্ষেত। দিবস কালে যতদূর নজরে আসে কেবল ধানক্ষেত আর সবজি ক্ষেত - তাহা দিগন্তের শেষ প্রান্তে গিয়া মিশিয়াছে। সন্ধ্যা গাঢ় হইল । রাস্তার মাঝখানে জীপ গাড়িটি ঝাকুনি খাইয়া থামিয়া গেল । তখনও প্রায় ছয় ক্রোশ পথ বাকি। মেঠো পথ জনশূন্য । আকাশে মস্তবড় পূর্ণিমার চাঁদ পরিলক্ষিত হইতেছে। সেই অপার্থিব চন্দ্রালোকের বন্যা পৃথিবীর সমস্ত দুঃখ যন্ত্রণা, অভাব-অনটন, হতাশার খড়কুটো গুলিকে অবহেলায় ভাসাইয়া লইয়া কোনো এক অজানার উদ্দেশ্যে যাত্রা করিয়াছে। অহংসত্বার বিরাজমানতা সেই আলোকে বিলীন হইয়া যাইতেছে। সেই আলোকের ঢেউ যেন জীবন সমুদ্রের শুষ্ক বেলাভূমি অপার্থিব আনন্দের জলরাশিতে ভরাইয়া দিয়া যাইতেছে। চালক বলিলেন বিশ ত্রিশ মিনিটের মধ্যেই গাড়ি ঠিক হইয়া যাইবে । ভাবিলাম এই সময়কাল অকারণে অপচয় না করিয়া পদব্রজে সম্মুখভাগে কিছুটা অগ্রসর হওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হইবে । মনের ও শরীরের উপকার হইবে। গাড়ি রাখিয়া পদব্রজে যাত্রা শুরু করিলাম। কিছুটা পথ অতিক্রম করিয়া , অনতিদূরে একটি কুটির অস্পষ্ট ভাবে আবছা আলোয় পরিলক্ষিত হইল। শুধু তাহাই নহে - তথা হইতে এক নারী ও পুরুষ কন্ঠের বাকবিতণ্ডার অস্পষ্ট আওয়াজ কর্ণগোচরে আসিতে থাকিল। প্রথম পর্যায়ে বাক্য সম্পূর্ন কর্ণগোচর না হওয়ায়, বক্তব্য বোধগম্য না হইলেও - ক্রমশ দূরত্ব হ্রাস হেতু তাহা বোধগম্য হইতে শুরু করিল। কুটিরখানির পশ্চাতপ্রান্ত ঘেঁষিয়া রাস্তাটি চলিয়া গিয়াছে। চারিপার্শে আর কোন গৃহাদি অবলোকিত হইল না। কুটিরের সম্মুখে একচিলতে ধপধপে উঠানটুকুতে জোৎস্না ঠিকরাইয়া পড়িতেছে। মাটির বারান্দার এক কোণে একটি কেরোসিন কুপি নির্লীপ্ত ভঙ্গিমায় জ্বলিতেছে। জ্যোৎস্নায় ভেসে যাওয়া সুদীর্ঘ খোলা মাঠ হইতে মৃদুমন্দ শীতল বাতাস বহিয়া আসিতেছে। কেরোসিন শিখা টি নিভু নিভু হইয়া, পুনরায় জ্বলিয়া উঠিতেছে। যেন বারবার মৃত্যুকে স্পর্শ করিয়া পুনরায় জীবনের বৃত্তে প্রত্যাবর্তন করিতেছে। শীত একটু অধিক অনুভূত হইতেছে। কুটিরটির পশ্চাতে আসিয়া পৌছাইলাম - বেশ কিছুটা পথ দ্রুতপদে হাঁটিয়া আসিয়া ক্লান্তি মোচনের নিমিত্তে ক্ষণকালের জন্য বিশ্রাম লইবারর উদ্দেশ্যে সেখানেই দন্ডায়মান রহিলাম। অন্দরমহল হইতে মহিলা কন্ঠে ভাসিয়া আসিল, " তোমার লজ্জা করে না? ওই পিতলের ঢাউস মত কি একটা হাতে নিয়ে সারা দিন পেরিয়ে সন্ধ্যার পর নবাবের মতো ঘরে ঢুকলে - ঘরে দাঁতে কাটবার মত একটা চাল নেই - বৃষ্টি হলে ঘরে শোবার একটু জায়গা থাকে না, ফাটা টালির ফাঁক গলে ঘরময় পানি পড়ে - একটা টালি পাল্টাবার ক্ষমতা নেই - কচি মেয়েটার মুখে একটু দুধ জোটে না। আর সারাদিন কাজ নেই কম্ম নেই - একটা পয়সা উপার্জনের মুরোদ নেই - সাঁজ পেরিয়ে পিতলের ঢাউস সরা নিয়ে এক দঙ্গল কচি কচি ছোঁড়াদের সাথে হিপ হিপ হুররে করতে করতে, রাজ্য জয় করে - ঘরে ফিরছে বাবু।" মনে হলো, পুরুষ পক্ষ যুদ্ধে গোহারা হইতেছে । পুরুষ কণ্ঠে কেবল মাত্র একবার শুনিলাম " আগে কিছু খেতে'তো দে, তারপর সারা রাত ধ'রে তুই চিৎকার করতে থাক্। আজ সারাটা দিন পেটে কিচ্ছু পড়েনি , খুব খাটুনি গেছে আজ। রোজ রোজ এ অশান্তি আমার ভাল লাগে না আর - এবার সব এক্কেবারে ছেড়ে ছুড়ে দিয়ে কবরে যাব।" "হ্যাঁ, তাই যাও । তাহলে আমিও বাঁচি" - মহিলা কা়ঁদিতে শুরু করিলেন। হঠাৎ গাড়ির হেডলাইটের তীব্র আলোকপাতে , ঝগড়া শুনিবার ঘোর কাটাইয়া বাস্তবে প্রবেশ করিলাম। বুঝিলাম আমার জীপ গাড়িটি আসিতেছে। কাছাকাছি আসিয়া সশব্দে গাড়িটি থামিতেই - কুটিরের ভিতর হইতে মাঝ বয়সী একটি লোক, খালি গায়ে, খালি পায়ে , লুঙ্গি পরিহিত অবস্থায় বাহির হইয়া আসিলেন - তাহার পশ্চাদ অনুসরণ করিয়া শাড়ি পরিহিতা এক রমনিও পথের উপর আসিয়া উপস্থিত হইলেন, তাঁহার হাত ধরিয়া সেথাই উপস্থিত হইল ছোট্ট ফুটফুটে একটি কন্যা - যেন সদ্য প্রস্ফুটিত একটি সতেজ পবিত্র ফুল - বয়স তিন কি চার হইবে। বুঝিতে কাল বিলম্ব হইল না যে ইনারাই সেই যুদ্ধরত স্বামী-স্ত্রী এবং তাঁদের 'দুধ না পাওয়া ' কন্যা সন্তান। মাঘী পূর্ণিমার উজ্জ্বল চাঁদের রুপালি আলোয় - খোঁচা খোঁচা দাড়ি যুক্ত মুখটি সহজেই চিনিতে পারিলাম - 'মহসিন' । বাকিটা অনুমান করিতে কাল বিলম্ব হইল না। কোথায় যেন হারাইয়া গেলাম। মহসিনের ডাকে ঘোর কাটিল " বড়বাবু - আপনি?" কহিলাম, " গাড়িটি বিকল হইয়া গিয়াছিল - তাই ..." "ঠান্ডা পড়েছে । আজ আমাদের বাড়িতে আপনাদের চা খেয়ে যেতে হবে। কিছুতেই ছাড়বো না " - মহিলা আনত মুখে , লাজুক ভঙ্গিমায় কহিলেন , "তুমি বাবুকে নিয়ে ভেতরে এসো । আমি আখাটা জ্বেলে গুড়-জল বসিয়ে দিচ্ছি " চাঁদের আলোয় মাটির বারান্দায় মাদুর বিছাইয়া বসিয়া পড়িলাম। উঠানের মাঝে কাঠের জ্বলন্ত উনানে আরো কিছু শুকনো পাতা চালান করিতে করিতে মহসিনের উদ্দেশ্যে মহিলা আনমনে কহিলেন , " কাল দুটো পাতিলেবু এনো দিকি - ঘর বোঝাই ওই পেতলের ছাইপাশ গুলো মেজেঘষে রাখতে হবে তো - তুমিতো হই হই করে এনেই খালাস।" সেই জ্বলন্ত পাতার আগুনের আলোয় দেখিলাম মহিলা হাসিতেছেন। চাঁদের আলোয় দেখিলাম মহসিনের মুখ খানি উজ্জ্বল হইয়া উঠিয়াছে। শিশুটি বাবার কোলে বসিয়া এক মনে চাঁদ দেখিতেছে। সেদিন স্বশরীরে , স্বর্গে বসিয়া, স্বর্গ সুধা পান করিতে করিতে , নিজের অজান্তেই, আমার চক্ষুদ্বয় অশ্রুপূর্ণ হইয়া উঠিল। সতীনাথ চট্টোরাজ বনগাঁ ২৩ শে কার্ত্তিক ১৪২৪ (ক্যানিং এর কর্মজীবনের স্মৃতি বিজড়িত একদিনের কথা)

Read More of Satinath

Prose meditation
Duty & Public Service
এক কালবৈশাখীর রাতে, ১৪২৫Public-service post

বাবুই পাখির বাসা

কালবৈশাখী । বাইরে ভীষন ঝড়। অশান্ত প্রবল বৃষ্টি । একটানা মেঘের গর্জন । ঘন কালো ঘুটঘুটে অন্ধকার। যেন প্রলয় চলছে। রাত এগারোটা। থানায় আজ লোকজন নেই - ফাঁকা। পুলিশ হেফাজতে থাকা দু'জন আসামী গভীর নিদ্রামগ্ন। আজ একটু উদাসীন লাগছে। কাজ ফেলে বাসায়...

Nature, River & SeasonsMemory & Childhoodবনগাঁ
Read
Poem
Duty & Public Service
May 11, 2017Literary text

নূপুর

বিচারকের চলে যাওয়ার খবর পেলেম। কোর্টের ভিতর তোর নূপুরের আওয়াজ পেলেম । মনে হল কাঁদছে নুপুর তার ধ্বনিতে, বিচারের দীপ নিভল বুঝি আচম্বিতে। শ্বশুর ঘরের জান্তবতার দীর্ঘ ঝড়ে, সাঁজের প্রদীপ নিভল যখন অনাদরে, বাবা যখন পেঁচিয়ে দড়ি মায়ের গলে , দাঁত চি...

Nature, River & SeasonsMemory & Childhoodবনগাঁ
Read
Photo caption
Duty & Public Service
5 April 2020Self-authored post

শিক্ষক

শিক্ষক — খবরটি শুনিয়া - নিতাই ডোম ও দুইজন উর্দিধারী সিপাই লইয়া , কৈখালী ঘাট হইতে নৌকায় উঠিয়া মাতলা নদী ধরিয়া কুলতলি অভিমুখে যাত্রা শুরু করিলাম। কার্তিক মাস। দিবস কাল গত হইতেছে। সূর্য পশ্চিমে হেলিয়া পড়িয়াছে। পশ্চিমাকাশ লালিমামন্ডিত হ...

Spirituality, Devotion & VedantaNature, River & Seasonsবনগাঁকুলতলি
Read
Prose meditation
River, Rain & Tide
4 June 2024Literary text

অপেক্ষা

যখন রাত্রি নামে , যুদ্ধ শেষে ঘরে ফিরে আসি, দেখি প্রবেশদ্বারের ডানদিকে উঠোনের কোণে স্বল্প আলোকে লাজুক আনত ভঙ্গিমায় মাথা হেঁট করে দাড়িয়ে আছে ঝাউ গাছ খানি। যেন সারাদিনের অপেক্ষার অবসান। মনে হয় প্রতিটা জীবনের জন্য অন্তত একটা অপেক্ষা প্রয়োজ...

Nature, River & SeasonsMemory & Childhoodবনগাঁ
Read
Prose meditation
Duty & Public Service
আজ সরস্বতী পুজোর দিন; user paste showed 9y-era commentsLiterary text

টেবু, রাজু (ক্যালকেলিয়া ফক্স), নীতু (কালা), তরুণ (উঁকি আসন) , ঝন্টু, গনেশ, গৌর গুরু, ছোটন, প্রবীর, কুমার কমল, প্রাইমারীর ছাদে...

টেবু, রাজু (ক্যালকেলিয়া ফক্স), নীতু (কালা), তরুণ (উঁকি আসন) , ঝন্টু, গনেশ, গৌর গুরু, ছোটন, প্রবীর, কুমার কমল, প্রাইমারীর ছাদে নুনলঙ্কা গুড়ো আর কুল- ইস্কুলের খিচুড়ি - বাবু দা , রথীন কাকা, কার্তিক দা- মাঠে / ব্রীজে, নৌকাতে উদ্দাম উল্লাস, ফাট...

Spirituality, Devotion & VedantaNature, River & Seasonsবনগাঁ
Read
Prose meditation
Devotion & Vedanta
ভোরের বেলা, জানুয়ারী মাস; user paste showed 9y-era commentsLiterary text

আজ বেশ ঠান্ডা। হিমেল বাতাস বহিতেছে। আমার বাসার শয়নকক্ষের পূর্ব কিনারার জানালার আরশি সাবলীল ভঙ্গিমায় অতিক্রম করিয়া এক অপার্থিব আলোক...

আজ বেশ ঠান্ডা। হিমেল বাতাস বহিতেছে। আমার বাসার শয়নকক্ষের পূর্ব কিনারার জানালার আরশি সাবলীল ভঙ্গিমায় অতিক্রম করিয়া এক অপার্থিব আলোক কিরণ শয্যার উপর ছড়াইয়া পড়িয়াছে । সে যেন ঈশ্বর প্রেরিত এক সোনালী অশ্ব - আমাকে তাহার পিষ্টে বসাইয়া লইয়া এক গণ্ড...

Spirituality, Devotion & VedantaNature, River & Seasonsবনগাঁ
Read