Police station, public duty, service, civic life, and institutional memory.
শিক্ষক
শিক্ষক — খবরটি শুনিয়া - নিতাই ডোম ও দুইজন উর্দিধারী সিপাই লইয়া , কৈখালী ঘাট হইতে নৌকায় উঠিয়া মাতলা নদী ধরিয়া কুলতলি অভিমুখে যাত্রা শুরু করিলাম। কার্তিক মাস। দিবস কাল গত হইতেছে। সূর্য পশ্চিমে হেলিয়া পড়িয়াছে। পশ্চিমাকাশ লালিমামন্ডিত হইয়া উঠিয়াছে। দৃশ্যমান পৃথিবীর পূর্ব প্রান্ত ক্রমশ অন্ধকারাচ্ছন্ন হইয়া উঠিতেছে। ক্লান্ত ডানায় ভর করিয়া অসংখ্য পাখিরা ঘরে ফিরিতেছে। নৌকাখানি পূর্ব হইতে পশ্চিম দিকে অগ্রসর হইতেছে। নদী বরাবর দু'পাশের মেটো রাস্তায়, কর্মান্তে দ্রুত পদব্রজে ঘরে ফেরা মানুষ আবছা পরিলক্ষিত হইতেছে। এ যেনো গৃহে প্রত্যাবর্তনের মাহেন্দ্রক্ষণ। কেবলমাত্র নদী ও নৌকোর ছলাৎ ছলাৎ মিলনধ্বনী একটানা কর্ণগোচর হইতেছে। কোথাও নদীর তীরে অবস্থিত মন্দির হইতে কাঁসর ঘণ্টাধ্বনি , কোথাও নদী পার্শস্হিত কুটিরাঙ্গিনার তুলসী মঞ্চ হইতে শঙ্খ ধ্বনি কর্ণকুহরে প্রবেশ করিতেছে। সিপাই দুইজন বিপরীতমুখী হইয়া উদাসচিত্তে কি যেন ভাবিতেছে। মাঝি দুইজন যন্ত্রবৎ নিরবচ্ছিন্ন দাঁড় টানিতেছে। নিতাই ডোম আমাকে সম্মান দেখানোর ভান করিয়া , গামছার আড়ালে দৃশ্যমানতা বজায় রাখিয়া, বঙ্গসুধা পান করিতেছে। ঘরে ফেরার আনন্দময় কিচিরমিচির গানের সুর ক্রমশ অবলুপ্ত হইতেছে। দৃশ্যমানতা প্রায় বিলুপ্ত। দূরে দূরে কম্পিত ক্ষীণ আলোক শিখা জ্বলিতেছে - নিভিতেছে , আবার জ্বলিতেছে আবার নিভিতেছে। বিগতরাত্রে দর্শিত স্বপ্নটি কিছুতেই মন হইতে দূরীভূত হইতেছে না। সারাটি দিবস বিভিন্ন কর্মময়তার ভিড়েও , সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক স্বপ্নটি চিত্তপটে একটি অস্পষ্ট কিন্তু স্থায়ী স্থান দখল করিয়া রহিয়াছে। আমি কচি কচি হস্তদ্বয় সম্মুখ পানে সরল ভঙ্গিমায় বাড়াইয়া রহিয়াছি। মটর মাস্টারমহাশয় আমার কোমল দুই করতলে বেদম বেত্রাঘাত করিতেছেন আর কহিতেছেন "তুই খুন করিয়াছিস, তুই খুন করিয়াছিস - । " হঠাৎ সেথায় আমার পিতৃদেব আবির্ভূত হইয়া কহিলেন " খুব মারুন মাস্টারমশাই , আরো মারুন। আমিতো উহাকে ভর্তি করিবার কালেই আপনাদের বলিয়াছিলাম, কথা না শুনিলে, উহার শরীরের হাড় কয়টি মাত্র আমার জন্য অবশিষ্ট রাখিবেন আর মাংস আপনাদের।" দেখিলাম আমার পিতৃদেব ও ছোটবেলার পাঠশালার সেই শিক্ষকমশাই , যিনি 'মটর মাস্টার' নামে খ্যাত ছিলেন, উভয়েরই দু চোখ ভরা জল। সেই অশ্রুবিন্দু শিশিরের ন্যায় আমার করতলে পড়িতেছে - তাহাতে বেত্রাঘাতের চিহ্ন মুছিয়া যাইতেছে ও যন্ত্রণার উপশম হইতেছে। হঠাৎ গগনভেদী বজ্র গর্জনে নিদ্রা তথা স্বপ্ন ভঙ্গ হইল। তখনো ভোর হয় নাই। কখন বৃষ্টি শুরু হইয়াছে। বাহিরে নিকষ কালো অন্ধকার। মাঝে মাঝে হঠাৎ বিদ্যুতালোকে দোদুল্যমান সিক্ত গাছগুলিকে ক্ষণিকের তরে দেখা যাইতেছে - আবার তৎক্ষণাৎ তাহা অন্ধকারের চাদরে ঢাকা পড়িয়া যাইতেছে। খোলা জানালা পথে প্রবেশ করিয়া অনাহূত বৃষ্টিবিন্দু আমার হাত দুইখানি ভিজাইয়া দিয়াছে। জানালা বন্ধ করিয়া, নিভে যাওয়া কেরোসিনের কুপিখানি পুনরায় জ্বালাইয়া দিলাম। নদীসংলগ্ন সুবিস্তীর্ণ উন্মুক্ত প্রান্তর হইতে আগত ঝোড়ো বাতাস শনশন শব্দে জানালার বাহিরে ক্রমাগত আঘাত করিতে থাকিলো। বহু বছর হইয়া গেল, মটর মাস্টারমশাই গত হইয়াছেন। শ্রেণিকক্ষে তাহাকে দেখিয়া কখনো কখনো হৃদ কম্পন শুরু হইত ঠিকই কিন্তু এক অদ্ভুত ভয়মিশ্রিত শ্রদ্ধা-ভক্তি ভালবাসা অনুভূত হইত। পরলোকগমনের কিয়ৎ দিন পূর্বে , শারদীয়ায় কর্মস্থল হইতে ছুটি লইয়া গ্রামের বাটিতে গিয়াছিলাম। অনাড়ম্বর আটচালা পূজামন্ডপ প্রাঙ্গণে সন্ধ্যারতি সমাপান্তে ধুতি-পাঞ্জাবি পরিহিত, বৃদ্ধ নু্ব্জপ্রায় মাস্টার মশাই কে দেখিয়া , আগাইয়া গিয়া তাঁহার পদযুগল স্পর্শ করিয়া প্রণাম করিলাম। তিনি আমার কর্ণযুগল মুলিয়া দিয়া, কপালে গভীর চুম্বন করিয়া বক্ষে জড়াইয়া ধরিলেন। এক স্বর্গীয় স্নেহময় উষ্ণতা অনুভব করিলাম - দুই চক্ষু অশ্রুতে ভরিয়া উঠিল। মাস্টারমশাই চলিয়া গেলেন, তাঁহাকে অনুসরণ করিয়া চলিয়া গেলেন বহু স্মৃতি বিজড়িত আরো অনেক শিক্ষক মশাই, চলিয়া গেলেন পিতৃদেবও। সহসা ঝাকুনিতে ভাবনার ঘোর কাটিল। নৌকা কুলতলি ঘাটে লাগিয়াছে। নৌকা হইতে অবতরণ করিলাম। ঘন অন্ধকারে ঢাকা , নির্জন নিশ্চুপ চারিধার, কেবল ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক। সেই ঘন অন্ধকারের বুক চিরে অপেক্ষারত দুইজন ব্যক্তি আমাদের দিকে অগ্রসর হইয়া আসিয়া কহিলেন ,"এই পথে, আমাদের অনুসরণ করুন"। নদীর তীর বরাবর মেঠো রাস্তায় অন্ধকারে হাঁটিতে শুরু করিলাম। প্রায় এক ক্রোশ পথ অতিক্রম করিয়া , গ্রামের এক প্রান্তে নির্জন নদী তীরে অবৈতনিক বিদ্যালয়ের ভগ্ন গৃহখানি ছাড়াইয়া গিয়া বাঁশের বেড়া দ্বারা বেষ্টিত এক মাটির গৃহে উপস্থিত হইলাম। চারিদিকে নিঃশব্দতা বিরাজমান। পঞ্চাশোর্ধ এক মহিলা মাটির বারান্দায় বসিয়া খুঁটিতে হেলান দিয়া শূন্য দৃষ্টিতে চাহিয়া রহিয়াছেন। দশ বারোজন লোক বারান্দা সংলগ্ন আঙ্গিনায় ইতঃস্তত দাঁড়াইয়া রহিয়াছে। বারান্দায় রাখা হারিকেনের আলোয় ঘরের খোলা দরজা দিয়া দেখিলাম , ধুতি-পাঞ্জাবি পরিহিত একজন প্রৌঢ় ব্যক্তি ঘরের আর কাঠ হইতে গলায় ফাঁস লাগাইয়া ঝুলিতেছেন, মুঠিতে তে ধরা এক টুকরো কাগজ। মৃত্যুর পূর্বে হারান মাস্টার লিখিয়া গিয়াছেন, " সাতদিন জেল খেটে আজ বাড়িতে ফিরেছি। সতীশ বড় ভালো , বড় মেধাবী ছেলে। কিন্তু একটু অমনোযোগী। একটু মনোযোগ সৃষ্টি করে দিতে পারলে একদিন ও অনেক বড় হবে - বিজ্ঞানী হবে - ডাক্তার হবে- ইঞ্জিনিয়ার হবে - সব হবে। বাবা সতীশ, একটু মনোযোগী হ বাবা। তোকে শ্রেণীকক্ষে প্রহারের অপরাধে পুলিশ আমাকে গ্রেপ্তার করেছে, আমি বন্দি ছিলাম - তাতে আমার কোন দুঃখ নেই। ছাত্রকে প্রহারের অপরাধে জেলফেরত শিক্ষকের অন্তরে শিক্ষক সত্তার মৃত্যু হয়। মৃত সত্তা নিয়ে শরীরী জীবন যাপন অর্থহীন, গ্লানিকর , যন্ত্রনাময়। আমি এখনো বিশ্বাস করি, আমি কোন ভুল করিনি। মনদিয়ে পড়াশোনাটা করিস বাবা। ইতি তোদের হারান মাস্টার।" মৃতদেহ নৌকায় তুলিয়া রওনা হইলাম। সতীনাথ চট্টোরাজ বনগাঁ
Read More of Satinath
Photo caption
Duty & Public Service
13 April 2020Public-service post
প্রায়শ্চিত্ত
প্রায়শ্চিত্ত কিছুদিন যাবত গ্রীষ্মের একটানা অসহ্য দাবদাহে ক্লান্ত হইয়া অবশেষে শেষ রাত্তিরে গ্রামের মানুষ অকাতরে স্বস্তির ঘুম ঘুমাইয়াছেন। কারন বহুদিন পর , গেল রাত্তিরে বেশ কিছুটা ভারী বৃষ্টি হইয়াছে। সিদ্ধেশ্বরী মন্দিরের পুরোহিত ভবানী ভট্ট...
Spirituality, Devotion & VedantaNature, River & Seasonsবনগাঁ
১লা বৈশাখ পুলিশের সামাজিক অনুভূতি গুলো বহুবছর আগেই নিজেদের অজান্তেই একটু একটু করে ক্রমাগত নিস্তেজ হতে হতে, হতে হতে — একদিন হৃদয়ের খাঁচা খুলে উড়ে যায় - তার খবর কে রাখে ? খাঁচা খুলে পালিয়ে যাওয়া সেই অশান্ত মনের উদ্ভ্রান্ত অনুভূতি, ক্লান্...
Spirituality, Devotion & VedantaNature, River & Seasons
চিরন্তন অবসন্ন অবসরে, হেমন্তের পরন্ত বিকেলে যুবকেরা একদল সারা মাঠ জুড়ে, চিৎকার চেঁচামেচি ফুটবল খেলে। সন্ধ্যা নিবিড় হয়, ঝাপসা অন্ধকার, খেলা শেষে শুরু হয় তার অন্বেষণ । মাঠের পশ্চিমে এক ঝাউয়ের তলায় তখনো আবছা আলোয়, তারে দেখা যায়। রিয়া,...
Spirituality, Devotion & VedantaNature, River & Seasonsবনগাঁকলকাতা
সে দিনটি ছিল মাঘী-পূর্ণিমা। তখন সন্ধ্যা প্রায় উত্তীর্ণ হইয়াছে। থানা হইতে প্রায় আট ক্রোশ দূরে, মাতলা নদীর চরের নির্জন মাঠে আয়োজিত গ্রাম্য ফুটবল টুর্নামেন্টের বিজয়ী দলের স্বীকৃতি স্বরূপ ধাতব নির্মিত মাঝারি মাপের স্মারকটি মহসিনের হাতে তুল...
Nature, River & SeasonsMemory & Childhoodবনগাঁক্যানিং