সতীনাথ চট্টোরাজOpening the archive doors
Writings Archive
Original Bengali text
Devotion & Vedanta

Surrender, God, Guru, Vedantic thought, translation, and spiritual commentary.

নেশা ! সতীনাথ চট্টোরাজ। (১) কার্তিক মাসের কৃষ্ণা একাদশী। ট্রেন থেকে নামলাম। প্রবল বৃষ্টি হচ্ছে। তার সাথে মুহুর্মুহু গগনভেদী বজ্রপাত...

নেশা ! সতীনাথ চট্টোরাজ। (১) কার্তিক মাসের কৃষ্ণা একাদশী। ট্রেন থেকে নামলাম। প্রবল বৃষ্টি হচ্ছে। তার সাথে মুহুর্মুহু গগনভেদী বজ্রপাত। নির্জন প্ল্যাটফর্ম। ঘুটঘুটে অন্ধকার। রাত্রি দুটো। বিদ্যুতের আলোয় বেশ কিছুটা দূরে টিকিট ঘরটি ছাড়া মাথাগোঁজার মত আর কোন আশ্রয় যেমন চোখে পড়লো না, ঠিক তেমনি অন্য আর এক জন যাত্রীকেও নজরে এলো না। অর্থাৎ আমি একা এই ট্রেন থেকে নামলাম। লম্বা হুইসেল বাজিয়ে বৃষ্টির মধ্যে ট্রেন প্লাটফর্ম ছেড়ে বেরিয়ে গেল। দৌড়ে আর লাভ নেই, নিমেষের মধ্যে ভিজে সপসপে হয়ে গেছি। ভাগ্যিস ছোটখাটো বেডিংটি 'হোল্ডাল' এর উপর দিয়ে প্লাস্টিক জড়িয়ে এনেছিলুম । হাতঘড়ি ও মানিব্যাগটা ট্রেনের মধ্যেই একটা প্লাস্টিকের প্যাকেটে জড়িয়ে ব্যাগের মধ্যে ঢুকিয়ে নিয়েছিলেম। ব্যাগের ভেতর জামা কাপড় গুলো নিশ্চয় এতক্ষণে জলকাচা হয়ে গেছে। একেবারে নতুন জায়গা। কাল প্রথমেই একটা বাসা ঠিক করতে হবে । এসব ভাবতে ভাবতে টিকিট ঘরের সামনে এসে পড়েছি। একটিমাত্র ঘর। আকারে বেশ বড়সড়। পশ্চিমের প্ল্যাটফর্মের দিকে মুখ করা খড়খড়ি লাগানো খিলেনের বিশাল দরজা - ভিতর থেকে বন্ধ। দরজার দুই পাশে একই ধরনের দুটি খড়খড়ি লাগানো বড় কব্জার জানলা - পাল্লা গুলো খোলা অবস্থায় দেওয়ালের সাথে সমান্তরালভাবে আটকানো আছে। উত্তর ও দক্ষিণের বারান্দার দিকেও দুটি করে একই ধরনের জানলা আছে - কিন্তু সেগুলো বন্ধ। টিকিট ঘরের তিনদিকে অর্থাৎ প্লাটফর্মের দিকে ও দুই পাশের খোলা চওড়া বারান্দার উপরে ছাদ দেওয়া। দুপাশের বারান্দায় দুটি করে পুরনো শাল কাঠের হেলান দেওয়া লম্বা ধরনের বেঞ্চ, পায়াগুলো মেঝের সাথে শক্ত করে আটকানো। ভিজে ব্যাগ ও হোল্ডাল বেঞ্চের উপর রেখে খোলা জানলা দিয়ে, হ্যারিকেনের স্তিমিত আলোয় ঘরের মধ্যে ধুতি পাঞ্জাবি পরিহিত প্রায় পঞ্চাশোর্ধ ব্যক্তিকে অফিশিয়াল টেবিল এর এক প্রান্তে খাতার উপর খাতা দিয়ে বালিশের মত তৈরী করে তার উপর মাথা রেখে চিৎ হয়ে শুয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে থাকতে দেখলাম। নিশ্চয়ই স্টেশন মাস্টার হবেন। জানলা দিয়ে চাপা স্বরে ডাকলাম , "ও মশাই একটু শুনবেন ?" - " কে? নিধি এলি?" ' চোখ বন্ধ রেখেই পাল্টা প্রশ্ন করলেন তিনি। - " আজ্ঞে না। আমি একজন যাত্রী । এইসবে ট্রেন থেকে নামলাম । পুরো ভিজে গেছি। একটু সাহায্য দরকার।" ভদ্রলোক টেবিল থেকে শরীরে একটা মোচড় দিয়ে নিচে নেমে ঘরের মেঝে থেকে হ্যারিকেনটা হাতে নিয়ে জানালার কাছে এসে সলতেটা একটু উস্কে দিয়ে হ্যারিকেনটা আমার মুখ বরাবর তুলে ধরে এক মিনিট আমায় নিরীক্ষণ করে মুখে আর কোন কথা না বলে সোজা ভেতর থেকে দরজা খুলে দিলেন। আপাত গম্ভীর স্বরে বললেন , "ভিতরে আসুন" ভিজে জিনিসপত্রগুলো ঘরের এক কোণে রেখে নিজের মত একটি কাঠের চেয়ারে বসলাম। বাইরে প্রবল বৃষ্টি সহ বিদ্যুতের ঝলকানি ও ঝড়ো হাওয়া বইছে। কোনরকম ভুমিকা ছাড়াই শুরু করলাম," আমার নাম মলয় চট্টোপাধ্যায়। কাজের সূত্রে এই প্রথম এখানে এলাম। কোনোকিছু চিনিও না জানিও না। তার উপর ট্রেনটা বড্ডো লেট হয়ে যাওয়াতে এই অবস্থা হলো। আমায় যদি একটু সাহায্য করেন অত্যন্ত কৃতজ্ঞ হব" ভদ্রলোক উদাসীনভাবে আমার মুখের দিকে চেয়ে থেকে জিজ্ঞাসা করলেন, " কি রকম সাহায্য ? - বলুন" - "আজ রাতটা আপনার এই টিকিট ঘরে আমাকে একটু আশ্রয় দেওয়া। আর - কাল সকালে এখানে কোথাও একটা আমার জন্য বাসাবাড়ি ঠিক করে দেওয়া।" এটুকু বলা মাত্রই ভদ্রলোক পরপর আমাকে বেশকিছু প্রশ্ন করতে শুরু করলেন যেমন আমরা বাংলাদেশি না এই দেশীয়, আমার গোত্র কি, কোথায় বাড়ি, বাড়িতে কে কে আছেন, পড়াশুনা কতদূর, কি চাকরি করি ইত্যাদি আরও নানান প্রশ্ন। আমিও তার প্রশ্নগুলোর উত্তর দিচ্ছিলাম ঠিকই কিন্তু দুই একটি প্রশ্নের উত্তর সযত্নে একটু ঘুরিয়ে বললাম। কথা বলতে বলতেই তিনি ঘরের এক কোণে একটি টেবিলের উপর রাখা কেরোসিন স্টোভ জ্বালিয়ে ও সেই টেবিলের উপরে রাখা কিছু চা তৈরির সরঞ্জাম ব্যবহার করে লিকার চা তৈরি করতে করতে করতে বলতে থাকলেন, "আপনি আমার চেয়ে বয়সে অনেক ছোট তাই আপনার অসুবিধা না থাকলে আমি আপনাকে তুমি বলে সম্বোধন করতে পারি। তাছাড়া আমিও চট্টোপাধ্যায়, কাশ্যপ গোত্র অর্থাৎ আমরা উভয়েই কাশ্যপ মুনির উত্তরপুরুষ ।," - "নির্দ্বিধায় আপনি আমাকে 'তুমি' বলবেন, সেটা আমারও ভাল লাগবে।" গল্পে গল্পে বেশ সময় কাটতে লাগলো। কখনো বাইরে প্রবল বর্ষণ, ঝড়ো হাওয়া তার সাথে বজ্রপাত। ভদ্রলোকের নাম নবেন্দু চট্টোপাধ্যায়। অকৃতদার। বয়স বাহান্ন থেকে চুয়ান্ন হবে। শক্তপোক্ত গরন। গায়ের রং ফর্সা। টিকালো নাক। সুশ্রী। লম্বায় প্রায় পাঁচ ফুট আট ইঞ্চি। মাথায় ঘন সাদা ঢেউ খেলানো চুল, উল্টে আচঁড়ানো। চোখে মোটা কালো ফ্রেমের ও মোটা কাঁচের হাই পাওয়ার চশমা। বিগত পাঁচ বছর একটানা এই শিমুলতলা হল্ট স্টেশনে স্টেশনমাস্টার হিসাবে নিযুক্ত আছেন। গ্রামের বাড়ি বাঁকুড়া জেলার প্রত্যন্ত গ্রামে। এখান থেকে প্রায় সাড়ে তিনশো কিলোমিটার দূর। কথায় কথায় জানা গেল প্ল্যাটফর্মের ঠিক বাইরেই মোরাম রাস্তার কোলঘেঁষে নিধি অর্থাৎ নিধিরাম চৌধুরীর ছোট্ট একটি দোচালা চায়ের দোকান ছাড়া এই শিমুলতলা হল্ট স্টেশনের আশেপাশের দুই কিলোমিটারের মধ্যে কোন গ্রাম বা বসতি নেই। তবে স্টেশনটি বহু পুরনো , সেই ব্রিটিশ পিরিয়ডের। স্টেশন থেকে দক্ষিণ দিকে মোরাম রাস্তা ধরে দু কিলোমিটার গেলেই শিমুলতলা গ্রাম। বড় বর্ধিষ্ণু এলাকা। আয়তনে সুবিশাল। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বেশ কিছু পুরনো জমিদার বাড়ি, তার মধ্যে কিছু কিছু বাড়িতে জমিদারদের বংশধরেরা এখনো বাস করেন এবং কিছু কিছু জমিদারবাড়ি সম্পূর্ণ জনমানব শূন্য ভগ্নদশা গ্রস্থ। বড় বড় আম বাগান , নারকেলবাগান, সবেদা বাগান, ঝিল, বিভিন্ন দেবদেবীর প্রাচীন মন্দির তথা নাটমন্দির ইত্যাদিতে পরিপূর্ণ এই গ্রাম। গ্রামের এক পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে সু-বিস্তীর্ণ গঙ্গা। সেখানে পারাপারের জন্য রয়েছে সরকারি ইজারা দেওয়া ঘাট। নবেন্দু বাবু শিমুলতলায় গঙ্গার পাশেই দোতলা একটি বিশাল ফাঁকা বাড়ির একতলাটিতে থাকেন। বাড়িটি জমিদারদের। তাদের কেউই আর এখানে থাকেন না । এই গ্রামে তাদের অগাধ সম্পত্তি। নবেন্দু বাবু তার পূর্বসূরী স্টেশন মাস্টারের কাছ থেকে থাকার জন্য এই ঘরটির চাবি সহ পুরো বাড়িটির অন্যান্য ঘরের চাবি পেয়েছিলেন। স্থানীয় স্টেশন মাস্টার, যিনি এখানে বদলি হয়ে আসেন, তিনি এই বাড়িতেই থাকেন এবং বাড়িটি দেখভাল করেন। বহু বছর ধরেই এই রেওয়াজ চলে আসছে। নবেন্দু বাবু প্রতিদিন সকালবেলা গঙ্গা স্নান সেরে পাশের শিব মন্দিরে পুজো দিয়ে তারপর ঘরে ফিরে স্বহস্তে রান্না করে একমুঠো সিদ্ধ ভাত খেয়ে প্রতিদিন সাইকেল চালিয়ে সকাল আটটার মধ্যে কাজে যোগ দেন। এই স্টেশনে প্রথম ট্রেন সকাল ন'টায় এবং শেষ ট্রেন রাত বারোটায়। নিধিরাম এর বাড়ি নবেন্দু বাবুর বাসা বাড়ি থেকে অনতিদূরে, প্রায় গ্রামের মাঝ বরাবর। নিধি ও প্রতিদিন সকালে নবেন্দু বাবুর সাথে সাইকেল চালিয়ে এসে চায়ের দোকান খোলে। নবেন্দু বাবু কোনদিন না আসতে পারলে সেদিন এই নিধিই আবার কাউন্টার খুলে যাত্রীদের টিকিট বিক্রি করে। যদিও নিধির সাত পুরুষের সাথে রেল দপ্তরের যোগাযোগ কোন কালেই ছিল না আজও নেই। তবে যে দু চারজন প্যাসেঞ্জার এই হল্ট স্টেশনে ওঠানামা করেন তারা বিলক্ষণ জানেন যে নবেন্দু বাবু আসতে না পারলে নিধিই টিকিট দেবে। রাত্রে দোকানে নিধি নিজের জন্য যখন রুটি ও আলু চচ্চড়ি তৈরি করে তখন ঐ একবারেই নবেন্দু বাবুর জন্যও দুটো রুটি করে নেয় এবং একসাথে আহারাদি সম্পন্ন করে রাত বারোটার সময় শেষ ট্রেন বেরিয়ে গেলে একসাথে মোরাম রাস্তা ধরে সাইকেল চালিয়ে, রায়চৌধুরীদের আমবাগান, মুখুজ্জেঝিল ও তৎসংলগ্ন জনমানবহীন ভগ্নদশা, মুখুজ্জেদের জমিদার বাড়ি ও ক্ষ্যাপা কালীর মন্দির ফেলে, গ্রামে ঢুকে নিজেদের আশ্রয়স্থলে ফেরে । এখানে নবেন্দু বাবু ও নিধি পরস্পর পরস্পরের একমাত্র সঙ্গী। নবেন্দু বাবু বিস্মৃত হয়ে গেছিলেন যে আজ নিধি দোকানে আসেনি, আজ তাদের পাড়ায় কালীপুজো হচ্ছে। তাই মলয়ের ডাক শুনে ঘুমের ঘোরে তাকে নিধি ভেবেছিলেন। যাইহোক নিধিদের পাড়ার সকলে মিলে এই কালী পুজোর আয়োজন করেছে এবং নিধি নিজেই সেই পুজোর উদ্যোক্তা। সেখানে পরপর অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটে চলেছে, অনেকের সন্দেহ খুনও হতে পারে। সন্ধ্যার পর এলাকায় লোকজনের চলাফেরা একদম কমে গেছে, প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে বললেই চলে। একটু অন্ধকার হতে না হতেই সব দোকান বাজার বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। সেই অমঙ্গল কাটাতেই এই পুজোর আয়োজন। যদিও বছর চল্লিশের নিধি তার বাড়িতে একাই মানুষ। বিয়ে শাদী করেনি। ছিলেন একমাত্র বৃদ্ধা মা , তিনিও গতবছর পূজার সময় গত হয়েছেন। প্রতিবার একটা লম্বা শব্দ করে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে নবেন্দু বাবু বলে যাচ্ছিলেন আর আমিও তাঁর কথাগুলো চুপকরে মন দিয়ে শুনছিলাম। চোখে পড়ল নবেন্দু বাবুর গলায় মোটা এক রুদ্রাক্ষের মালা। ভোরের আলো সবেমাত্র ফুটে উঠছে। হ্যারিকেনের কাচটা কেমন যেন ঘোলাটে হয়ে গেছে। সেই কাচ ভেদ করে তখনো এক হলদেটে ক্লান্ত আলো টেবিলের অল্প জায়গা আলোকিত করছে। বৃষ্টি ছেড়েছে কিন্তু ঝড়ো হাওয়া বয়ে চলেছে। নবেন্দু বাবু বললেন, চলো বেড়িয়ে পরা যাক। এরপর বৃষ্টি আবার জোরে আসলে ভিজে যেতে হবে। তোমাকে তো বলেছি, আমি যে বাড়িতে থাকি সে বাড়িতে একতলা দোতলা মিলে অনেক গুলোই ঘর আছে। ঘরগুলোর চাবি আমার কাছেই থাকে। তুমি না হয় তোমার পছন্দমত একটা ঘরে আপাতত থেকে যাবে। এরমধ্যে কিছু একটা ব্যবস্থা করে নেওয়া যাবে। নবেন্দু বাবু অবিন্যস্ত খাতাপত্র গুলো টেবিলের এক পাশে গুছিয়ে রাখলেন। হ্যারিকেনের কলের সাহায্যে কাচটা উঁচু করে তুলে মাথা হেঁট করে কাচের নিচ দিয়ে সলতের উপর ফু দিয়ে তা নেভালেন। চারপাশের জানালাগুলো বন্ধ করে একপাশে রাখা সাইকেলটি ঘরের বাইরে বের করলেন। কাজের ধরন দেখে বোঝা গেল তিনি নিত্তনৈমিত্তিক এ কাজ করে বেশ পটুতা অর্জন করেছেন। আমিও আমার ব্যাগটি বাঁ'কাঁধে ও হোল্ডালটি ডানহাতে তুলে নিয়ে নির্বাক ভাবে তাকে অনুসরণ করে ঘরের বাইরে বেরোলাম। স্টেশন থেকে রাস্তায় নেমে নবেন্দু বাবুর কথা মত হোল্ডালটি তার সাইকেলের ক্যারিয়ারে চাপিয়ে দিয়ে দুজনে পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করলাম। ভীষণ ঝড়ো হাওয়া বইছে। আকাশ সবেমাত্র আবছা লাল। এক আলো-আঁধারি পরিবেশ। দু'চারটে পাখি বিক্ষিপ্তভাবে বাসা ছেড়ে সবেমাত্র আকাশের বুকে ডানা মেললেও সকলে নিশ্চয়ই এখনও বাসা ছেড়ে বাইরে আসেনি। হালকা শীত লাগছে। প্রায় দুই কিলোমিটার দু দিক ফাঁকা মোরাম রাস্তা হেঁটে পার করে গ্রামে ঢুকলাম। এরপর কোথাও বিশালাকৃতি ভগ্নপ্রায় জমিদার বাড়ি, কোথাও কালী মন্দির, নাটমন্দির, কোথাও সুবৃহৎ ঝিল, সাধারণ বসতি, বাজার, গ্রন্থাগার ইত্যাদি পার করে এসে এক সুউচ্চ মাটির বাঁধ এর সামনে এসে উপস্থিত হলাম। বন্যার সময় গঙ্গার জল যাতে গ্রামে ঢুকতে না পারে তার জন্যই এই বাঁধ - নবেন্দু বাবু জানালেন। এ পাশ দিয়ে হেটে বাঁধের উপরে উঠে ও পাশ দিয়ে আবার নিচে নামলাম। তারপর দক্ষিণ দিক বরাবর এক ফাঁকা সরু রাস্তা ধরলাম। রাস্তার দু'পাশের বাবলা গাছের সারি ও ঘন বনকলমির জঙ্গল। দুপাশের বিস্তীর্ণ জমিতে কেবলমাত্র আখের চাষ। আখ গাছগুলি মানুষের থেকেও লম্বায় উঁচু। সন্নিবিষ্ট আখ গাছের ভিতর দিয়ে অসংখ্য সরু সরু সোজা আলপথ বিভিন্ন দিকে চলে গেছে। অত্যন্ত সংকীর্ণ সে পথ জনসাধারণের চলাচলের জন্য নয় কেবলমাত্র চাষের প্রয়োজনে ব্যবহৃত হয়। ঝড়ো হওয়ায় আখের পাতাগুলো একে অপরের সাথে ঘর্ষণ খেয়ে খসখস শব্দ তুলছে। মিনিট কুড়ি হাঁটার পর এই সরু মেঠো পথের ডান দিকে বেশ কিছুটা ফাঁকা জায়গা জুড়ে এক মস্ত বটগাছের নিচে বহু পুরনো আমলের চারিদিক খোলামেলা আটচালা দক্ষিণমুখী এক কাছারিবাড়ি , পুরনো আমলের বাংলো প্যাটার্নের। আসবেষ্টসের ছাউনি কয়েক প্রস্থ পিচচট্ দিয়ে ঢাকা। বাড়িটির চারপাশে উঁচু ও মস্ত চওড়া বারান্দা। দক্ষিণ দিকের বারান্দায় একটি বেশ বড়সড় পুরনো আমলের মোটা পায়া যুক্ত কাঠের টেবিল ও হ্যান্ডেল লাগানো কাঠের একটি চেয়ার। পূর্ব দিকের বারান্দায় গোটা চারেক দড়ির খাটিয়া। অপরদিকে মস্ত বড় বটগাছের আশেপাশে আগাছার জঙ্গল ও তার মাঝে বেশ কয়েকটি বহু পুরনো আমলের অব্যবহৃত জং ধরা চেনট্রাক্টর তার উপরেও নানান আগাছা জন্মেছে। হঠাৎ খেয়াল করেই দেখি সামনে অনতিদূরেই বিস্তীর্ণ গঙ্গা বয়ে চলেছে। ওপার আবছা দেখা যাচ্ছে। দক্ষিণ-পূর্ব কোন বরাবর গঙ্গার কোল ঘেঁষে পুরনো আমলের মস্ত এক দোতলা বাড়ি। ' ঐ হল আমার বাড়ি' - নবেন্দু বাবুর আওয়াজে সম্বিত ফিরল। এতক্ষণ কোথায় হারিয়ে গিয়েছিলেম বলা মুশকিল। গঙ্গার ধার বরাবর বিশালাকৃতির বনেদি দোতলা বাড়ি। চারপাশে বাড়ি আর মাঝখানে অনেকটা বড় বাঁধানো উঠান। একতলা ও দোতলার ভিতরে ও বাইরের দিকে, কোমর পর্যন্ত উচ্চতার কাঠের রেলিং দিয়ে ঘেরা ও উপরে ছাদ দেওয়া চারপাশে একটানা বারান্দা। অনেকটা চওড়া। একতলা এবং দোতালার বাইরের ও ভিতরের দিকের টানা বারান্দা দিয়ে পুরো বাড়িটাকে একবারেই পরিক্রমন করা যায়। ভিতরের দিকের বারান্দার চারটি কোন থেকে শাল কাঠের পুরনো আমলের সিঁড়ি দোতলায় উঠে গেছে। বারান্দার কিনারা বরাবর, বাড়ির ভিতর ও বাইরের, প্রতিটি দিকে তিনটে করে স্তম্ভ। উঠোনের উত্তর-পূর্ব কোণে , কপিকল যুক্ত, মস্ত বড় গোলাকৃতি বাঁধানো ইঁদারা। উঠোনের ঠিক মাঝখানে তুলসী মন্দির। উত্তর ও দক্ষিণ দিকের মাঝ বরাবর দুটি বাড়ির ভিতরে যাতায়াতের পথ। অর্থাৎ উত্তর ও দক্ষিণের বাইরের বারান্দা পার হয়ে এসে ভিতরের বারান্দায় প্রবেশ করে উঠোনে পৌঁছতে হয়। এই যাতায়াতের পথে কোনো দরজা নেই অর্থাৎ যে কেউ যেকোনো সময় বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করে একতলা ও দোতলার ভিতর ও বাইরের দিকের বারান্দায় ঘুরে বেড়াতে পারে। উত্তর দিকের খোলা অংশ দিয়ে বাড়ির ভিতর প্রবেশ করে দক্ষিণ দিক দিয়ে সোজা বেরিয়ে গেলে, মাত্র পঞ্চাশ মিটার দূরেই, গঙ্গার তীরে পৌঁছে যাওয়া যায়। উঠোনে দাঁড়িয়ে একতলার উত্তর-পূর্ব কোণের দক্ষিণমুখী ঘরটিকে নির্দেশ করে নবেন্দু বাবু বললেন এই ঘরটিতে আমি থাকি। আমি একটা ঘর নিয়েই থাকি। এ বাড়ি প্রায় দেড়শ বছর আগেকার। দেখলে বুঝতে পারবে, এক একটা ঘরের আয়তন আজকালকার দিনের ঘরের প্রায় চারটি ঘরের সমান। কাঠের কড়ি বর্গার ছাদ । প্রায় কুড়ি ফুট উঁচু হবে। বুঝতে পারছ কিনা জানিনা না, এই বাড়ির একতলায় আর দোতলায় বারোটি করে ঘর আছে। মোট চব্বিশটি ঘর। উত্তর ও দক্ষিণে চারটি চারটি করে, পূর্ব ও পশ্চিমে দুটি দুটি করে। প্রতিটি ঘরেই দু'পাশের বারান্দার দিকে দুটি করে দরজা আছে। দোতলার দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে ঘরটিতে তুমি থাকতে পারো। ঘরটিতে ন্যূনতম প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র সবই আছে। তোমার কোন অসুবিধা হবে না। নবেন্দু বাবু তার ঘরে গিয়ে চাবি নিয়ে এলেন। হোল্ডাল ও ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে দক্ষিণ-পশ্চিম কোণের কাঠের সিঁড়ি বেয়ে নবেন্দু বাবুর সাথে দোতলায় উঠলাম। উত্তর দিকের বারান্দা সংলগ্ন ডান হাতের প্রথম ঘটিল দরজার তালা খুলে ঘরে ঢুকতেই একটা সোদা গন্ধ পেলাম। ঘরটি বিশালাকৃতির। উত্তর ও দক্ষিণে দুটি করে জানালা ও দুটি করে দরজা। সব দরজা-জানালায় খড়খড়ি লাগানো। সমস্ত দরজা জানলা গুলো খুলে দিতেই দক্ষিনে প্রবাহিত সুবিস্তীর্ণ গঙ্গা নজরে এলো। নিরবিচ্ছিন্ন ঠান্ডা ঝড়ো বাতাস এক নিমেষে সমস্ত ঘরটিকে সতেজ করে তুলল। ঘরের এক পাশে একটি পুরনো আমলের গদি পাতা খাট। এক কোণে একটি কাঠের টেবিল ও চেয়ার। তার পাশেই একটি কাঠের আলমারি। দেওয়ালের সাথে লাগানো আয়না ও কতগুলো তেল রঙে আঁকা ছবি। দক্ষিণের বারান্দায় দাঁড়িয়ে প্রবাহমান গঙ্গার রুপ দেখতে দেখতে হারিয়ে গেছিলাম। "আপনের চা" - চমকে উঠে পিছনে তাকিয়ে দেখি, চায়ের কাপ প্লেট হাতে, ষাটোর্ধ্ব এক ব্যক্তি। খাটো করে ধুতি পরা, গায়ে একটা ফতুয়া। মাথায় খুব ছোট ছোট খোঁচাখোঁচা কাঁচাপাকা চুল। খোঁচাখোঁচা কাঁচাপাকা গোঁফ দাড়ি। খালি পা। আমাকে কিছু জিজ্ঞেস করার সুযোগ না দিয়ে টেবিলের উপর কাপ প্লেট টা নামিয়ে রেখে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। কিছুক্ষণের মধ্যেই আবার হাতে করে একটু ঝাড়ু ও একটুকরো কাপড় নিয়ে ফিরে এসে , ঘরের মেঝে পরিষ্কার করে ও আসবাবপত্র গুলো মুছে দিয়ে বেরিয়ে গেল। আমি আমার মতো করে ঘরটা গুছিয়ে নিয়ে , ভিজে জিনিসপত্রগুলি বাইরের দিকের বারান্দার রেলিঙে মেলে দিলাম। বেলা এগারটা টা। বৃষ্টি থেমে গেছে। আকাশ এখন মেঘলা। ঝোড়ো হাওয়ার দাপট কমলেও , একবারে থেমে যায়নি। নিচ থেকে নবেন্দু বাবু চিৎকার করে বললেন, ' মলয় স্নান করে নাও, বেলা হয়ে গেছে। আজ দুপুরে খিচুড়ি বেগুন ভাজা।' নবেন্দু বাবুর গলা শুনে ভিতরে দিকের বারান্দায় এসে নিচে তাকিয়ে দেখি ঘরের সামনের বারান্দায় স্টোভ জ্বালিয়ে তিনি খুন্তি দিয়ে খিচুড়ি নাড়ছেন। তার পরনে একটি গেরুয়া রঙের ফতুয়া ও গেরুয়া কাপড়। গাট্টা গোট্টা লোকটি তার সামনে দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে আছে। নিচে নেমে এসে , নবেন্দু বাবুর সামনাসামনি উপরে দাঁড়িয়ে ওই লোকটির দিকে তাকাতেই নবেন্দু বাবু পরিচয় করিয়ে দিলেন - ও গঙ্গারাম ঠাকুর। আসার সময় রাস্তার পাশে যে ফার্ম দেখলে , ওই ফার্মের দারোয়ান। আমি ওকে ঠাকুর বলেই ডাকি। ওই ফার্মের ইনচার্জ আছেন লালাবাবু মানে লালচাঁদ তেওয়ারি। লালাবাবু ও ঠাকুর ওই ফার্মেই থাকে। আর আমি এখানে থাকি। এই তিনজন ছাড়া এই এলাকা কিন্তু পুরোপুরি জনশূন্য। যাইহোক যাও স্নান টা সেরে নাও। অভ্যাস মত সমস্ত শরীরে সরষের তেল মালিশ করে ইঁদারার জলে স্নান সারলাম। ঠাকুর ফার্মে চলে গেছে। বারান্দায় পাশাপাশি বসে আমি ও নবেন্দু বাবু একসাথে বেগুন ভাজা সহযোগে খিচুড়ি খেলাম। যেন অমৃত। আসার পর থেকে এখানের পরিবেশ বুঝিয়ে দিয়েছিল যে এখানে নিজেদের কাজ নিজেদেরই করে নিতে হবে। সুতরাং খাওয়া শেষে আমি আমার খাবার খালা ও রান্নার হাঁড়ি, কড়াই সহ টুকটাক বাসনপত্র নিজের হাতেই ধুয়ে বারান্দার এক কোণে গুছিয়ে রাখলাম। এতে নবেন্দু বাবু কোন আপত্তি করলেন না। তুমি বিশ্রাম করো , আমারও দুপুরে খাওয়ার পর একটু বিশ্রাম করার অভ্যাস। এই বলে নবেন্দু বাবু তার ঘরে ঢুকে ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে দিলেন। আমি আর উপরে না উঠে দক্ষিণের সদর দরজা হয়ে গঙ্গার ধারে গিয়ে পৌঁছলাম এবং গঙ্গার দক্ষিণ তীরে পশ্চিম বরাবর সোজা হাঁটতে শুরু করলাম। নদী এখানে ভীষণ চওড়া এবং বেশ স্রোত ও আছে। মাঝেমধ্যে দুই-একটা পণ্য বোঝাই দাঁড়টানা নৌকো ভেসে যেতে দেখা যাচ্ছে। চারিদিক একেবারে নির্জন। কেবলমাত্র গঙ্গার বয়ে চলার কুলু কুলু ধ্বনি ও পারে এসে ধাক্কা খাওয়ার একটানা ছলাৎ ছলাৎ শব্দ। কোথাও ভাঙা পারের কিনারায় অসংখ্য ছোট ছোট গর্তে গাঙশালিখের বাসা । কিচিরমিচির শব্দে কোলাহল তুলে ঝাঁক বেঁধে তারা কোথাও একসাথে পাশাপাশি বাসায় ঢুকছে, কোথাও কোথাও পাশাপাশি বাসা ছেড়ে ঝাঁক ধরে কোথায় বেরিয়ে যাচ্ছে কে জানে। এরপর শ্মশান। ইতস্তত নিভে যাওয়া চিতা। ছড়িয়ে থাকা পোড়া কাঠ কয়লা। অনতিদূরে চারটি থামের উপর চারিদিক খোলা উপরে ছাদ দেওয়া একটি প্রতীক্ষালয়। নিশ্চয়ই শ্মশান যাত্রী দের উদ্দেশ্যে নির্মিত। শ্মশান ছাড়িয়ে আরও কিছুটা এগিয়ে গেলেম। সামনে এক পারাপারের বাঁধানো ঘাট। ঘাটে ঠিক উপর গঙ্গার পাড়ে খড়ের চাল ও মলি বাঁশের বেড়ার লম্বাটে ধরণের একটি ঘর। এটি ঘাট বাবুর থাকার ঘর। সামনে টিনের দরজা। দরজার সামনে বাঁশের মাচা তার উপর একটি ক্যাশ বাক্স। মাচা ও তার সামনের অংশটির উপরও খড়ের চাল দেওয়া। মাচার ঠিক সামনে দিয়ে দু'পাশে বাঁশের শক্তপোক্ত রেলিং তৈরি করা।যাতে যাত্রীরা আগে পাড়ানি জমা দিয়ে সারিবদ্ধ ভাবে নৌকায় উঠতে পারে - তার জন্য । একটি মস্ত নৌকা ওপারে যাবার জন্য অপেক্ষায় আছে, তাতে মাত্র ছয় কি সাত জন যাত্রী। মাঝি দুজনের উদগ্রীব দৃষ্টি রাস্তার দিকে - যদি এর মাঝে আরো দুই একজন এসে যায়, এই আরকি। আনমনা হয়ে বহুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম। কার্তিক মাস এখন সন্ধ্যা অপেক্ষাকৃত তাড়াতাড়ি নামে। সূর্য রক্তিম বর্ণ ধারণ করে পশ্চিম কোলে ঢলে পড়ছে। ঝাঁকে ঝাঁকে গাংশালিক উড়ে এসে ভাঙ্গনের পারে নিজের নিজের বাসায় ঢুকে পড়ছে। আমাকেও এবারে ফিরতে হবে। সুতরাং ঘরে ফেরার উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। কিছুটা ফেরার পর গঙ্গার পাড় বরাবরএকটি কংক্রিটের তৈরি বেঞ্চ নজরে পড়লো। তার পিছন দিকে খোদাই করে লেখা আছে 'অবসর'। অন্ধকারের চাদর জড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে। ফিসফিস করে বৃষ্টি শুরু হল। দ্রুত পা চালিয়ে বাড়ি ফিরে দেখি নবেন্দু বাবু ও ঠাকুর একটি হ্যারিকেনের আলোয় স্টোভ জ্বালিয়ে রুটি তৈরি করছে। কিছুটা দূরে আর দুটি হ্যারিকেন টিমটিম করে জ্বলছে। নবেন্দু বাবু রুটি বেলে দিচ্ছেন আর ঠাকুর তাওয়াতে সেঁকছে। আমার দিকে নজর পড়তেই নবেন্দু বাবু বললেন - কোনদিকে গিয়েছিলে ঘুরতে? একটা হ্যারিকেন নিয়ে উপরে গিয়ে জামা কাপড় ছেড়েছুড়ে এসো। ওটা তোমার ঘরেই রেখে এসো। বারান্দায় একটা হ্যারিকেন সারারাত জ্বলে। অসুবিধা হবে না। উনার কথা শেষ হলে বললাম, আজ সবেমাত্র পারের ঘাট পর্যন্ত গেছিলাম। হ্যারিকেন নিয়ে উপরের ঘরে গেলাম। জামা কাপড় পাল্টে আমার ছোট্ট টর্চ লাইটটা নিয়ে পুনরায় নিচে নেমে এসে ওদের পাশেই মেঝেতে বসে পড়লাম। এত বড় বাড়ীটা অন্ধকারের মধ্যে যেন একটা দৈত্যের মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে। কেবলমাত্র বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ আর ঝি ঝি পোকার ডাকের আওয়াজ একত্রিত হয়ে এক বিচিত্র শব্দবিন্যাস সৃষ্টি করেছে। নবেন্দু বাবু মাঝে মাঝে দু একটা কথা বলছেন ঠিকই কিন্তু ঠাকুর একবারেই চুপচাপ কেমন যেন জগৎ জীবন সম্পর্কে উদাসীন একটি যন্ত্রের মত একটি কাঠের পীঁড়ের ওপর বসে স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে একনাগাড়ে রুটি সেঁকছে । রুটি সেঁকা শেষ হলে ঠাকুর কোন কথা না বলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। নবেন্দু বাবু নিজে থেকেই বললেন , ঠাকুর ভীষণ চুপচাপ। আচ্ছা ভালো কথা, বাড়িতে থাকলে আমি কিন্তু সন্ধ্যা আটটার সময় রাতের খাবার খেয়ে নি, এতে তোমার কোন অসুবিধা নেই তো? আমি বললাম, না না, এতে অসুবিধার কি আছে। শুনেছি পশ্চিম দেশের লোকেরা সন্ধ্যা সাতটার মধ্যে রাতের খাওয়া সেরে নেন । এতে নাকি খুব ভালো হজম হয়। নবেন্দু বাবু আমাকে তার ঘর থেকে কয়েকটি বই বের করে আমার হাতে দিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন পড়াশোনা করতে আমার ভালো লাগে কিনা, বইগুলোর উপরের পাতা দেখতে দেখতে উত্তর দিলাম , আমি বই পড়তে ভালোবাসি। দেখলাম কিছু বই ধর্ম মূলক যার মধ্যে গীতা ও উপনিষদ আছে, রবীন্দ্রনাথ ও শরৎচন্দ্রের কয়েকটি বই আছে । আমি নবেন্দু বাবুর ঘরে প্রবেশ করার কোনো আগ্রহ দেখালাম না, তিনিও কিছু বললেন না। রাত আটটা নাগাদ খাওয়া-দাওয়া শেষ করে দোতলায় আমার ঘরে ঢুকলাম। দুপাশের দরজা বন্ধ করে, বাড়ির ভিতরে দিকের এবং গঙ্গার দিকের জানালার খড়খড়ি অল্প ফাঁকা রেখে হ্যারিকেনের আলোটা একবারে কমিয়ে দিয়ে টানটান হয়ে শুয়ে পড়লাম। সারাদিন ভীষন ঝক্কি গেছে। এখানে কিন্তু একটিও মশা নেই। খড়খড়ির ফাঁক দিয়ে দক্ষিণ দিকের গঙ্গার ঠান্ডা বাতাস ঘরে ঢুকেছে। আমাদের জীবন নিয়ে আকাশকুসুম কল্পনা আসতে থাকলো। হ্যাঁ , একটা কথা বলা হয়নি। আমার এক নিত্য সঙ্গী আছে - একটি ছবি, ঠাকুর অলকানন্দ দেবতপস্বীর - তাকে কখনো আমি চোখে দেখিনি, আমার জন্মের আগেই তিনি পরলোক গমন করেছেন। কিন্তু ছোটবেলা থেকেই পারিবারিক সূত্রে তার মহিমার গল্প শুনে তঁকেই গুরুদেব হিসাবে বরণ করেছি। এই ছবিটি কোনদিন আমার সঙ্গ ছাড়া হয়নি। সেই কৈশোর কাল হতে যেখানেই গেছি এটি আমার সঙ্গে গেছে। ছাত্রজীবনে হোস্টেলে এবং কর্মজীবনে বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণকালে আমি যেখানেই দিন রাত কাটিয়েছি বা কাটাই সেখানে তিনিও আমার সঙ্গী থাকেন। এই ঘরেও প্রবেশ করা মাত্রই ব্যাগ থেকে গুরুদেবের ছবিটি বের করে সেটিকে সযত্নে দেওয়ালে গায়ে, আগে থেকেই পুঁতে রাখা একটি পেরেকে, ঝুলিয়ে রেখেছি। হ্যারিকেনের মৃদু আলোয় গুরুদেবের মুখের ছবি জ্বলজ্বল করছে। কখন ঘুমিয়ে গেছি। কি একটা মৃদু সুর কানে আসছে। ঘুম ভেঙে গেল। মোবাইল ফোনটি চার্জ শেষ হয়ে বন্ধ হয়ে গেছে। হাত ঘড়িতে দেখলাম রাত তিনটে পঁয়তাল্লিশ। এতো সারেঙ্গীর আওয়াজ। এত রাতে সারেঙ্গী ? কে বাজাচ্ছে? বাগেশ্রী রাগের সুর মূর্ছনায় গভীর রাতের চারিদিক ভেসে যাচ্ছে। অসাধারণ শিল্প নৈপুণ্য যা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। কিন্তু কে বাজাচ্ছে? এই মায়াময় সুর যেন মনের শুদ্ধ তন্ত্রী থেকে প্রকাশিত হয়ে মেঘলা আকাশে ডানা মেলে অন্য লোকে যাত্রা করছে। ঘর থেকে বাইরে বেরোনো ঠিক হবে কিনা বুঝতে পারলাম না। কোন অতিপ্রাকৃতিক বা অনৈসর্গিক বিষয় নয়তো ? চলবে ...

Read More of Satinath

Prose meditation
Devotion & Vedanta
30 September 2024Literary text

নেশা !

সতীনাথ চট্টোরাজ। (১) কার্তিক মাসের কৃষ্ণা একাদশী। ট্রেন থেকে নামলাম। প্রবল বৃষ্টি হচ্ছে। তার সাথে মুহুর্মুহু গগনভেদী বজ্রপাত। নির্জন প্ল্যাটফর্ম। ঘুটঘুটে অন্ধকার। রাত্রি দুটো। বিদ্যুতের আলোয় বেশ কিছুটা দূরে টিকিট ঘরটি ছাড়া মাথাগোঁজার মত আ...

Spirituality, Devotion & VedantaNature, River & Seasonsবাঁকুড়াঢাকা
Read
Photo caption
Devotion & Vedanta
5 June 2020Book evidence

মৃগনয়না

মৃগনয়না গ্রামেটির নাম কৃষ্ণমাটি। অধুনা নদীয়া জেলায় অবস্থিত। তবে লোকের মুখে মুখে কবে যে তা কৃষ্ণাটি হয়ে গেছে সে খবর কারো জানা নেই। শরিকানা সম্পত্তির পরিচিতি ও ভাগ বাটোয়ারার নিষ্পত্তির কারণে বহু বছর পর সেখানে যেতে হচ্ছে। আজই বিকালে বাংলা...

Spirituality, Devotion & VedantaNature, River & Seasonsনদীয়াবাঁকুড়া
Read
Prose meditation
Night, Window & Solitude
unknown exact date from pasted Facebook copyLiterary text

অপার্থিব

জীবনের এক চূড়ান্ত সংকটময় কালের কথা আজ মনে পড়ছে। তখন দিশাহীন আমি - যেন ক্রমাগত হারিয়ে যাচ্ছি গভীর আঁধারে। সেদিনের সেই কুয়াশাঘন , অন্ধকারাচ্ছন্ন জীবন পথে শক্ত করে হাত ধরলেন বাবা। বৃহৎ উঠানটার মাঝে, ইজিচেয়ারে আধশোয়া হয়ে নিষ্পলক আকাশের...

Spirituality, Devotion & VedantaNature, River & Seasons
Read
Reel / video
River, Rain & Tide
12 May 2019Self-authored post

চিরন্তন

চিরন্তন অবসন্ন অবসরে, হেমন্তের পরন্ত বিকেলে যুবকেরা একদল সারা মাঠ জুড়ে, চিৎকার চেঁচামেচি ফুটবল খেলে। সন্ধ্যা নিবিড় হয়, ঝাপসা অন্ধকার, খেলা শেষে শুরু হয় তার অন্বেষণ । মাঠের পশ্চিমে এক ঝাউয়ের তলায় তখনো আবছা আলোয়, তারে দেখা যায়। রিয়া,...

Spirituality, Devotion & VedantaNature, River & Seasonsবনগাঁকলকাতা
Read
Prose meditation
River, Rain & Tide
4 June 2024Literary text

অপেক্ষা

যখন রাত্রি নামে , যুদ্ধ শেষে ঘরে ফিরে আসি, দেখি প্রবেশদ্বারের ডানদিকে উঠোনের কোণে স্বল্প আলোকে লাজুক আনত ভঙ্গিমায় মাথা হেঁট করে দাড়িয়ে আছে ঝাউ গাছ খানি। যেন সারাদিনের অপেক্ষার অবসান। মনে হয় প্রতিটা জীবনের জন্য অন্তত একটা অপেক্ষা প্রয়োজ...

Nature, River & SeasonsMemory & Childhoodবনগাঁ
Read
Prose meditation
Devotion & Vedanta
15 May 2024Literary text

"আশা - নিরাশা"

অভাব বোধ আছে । থাকুক। তবে তা না পাওয়ার জন্য আর কোন ক্ষোভ নেই, রাগ নেই, অভিমান নেই, অনুযোগ নেই । এ বিষয় এখন বোধগম্য হয়েছে যে, ঈশ্বর আমাদের মুক্তি দিতে চাননি, তাই আমাদের মানসিক পরাধীনতার শৃঙ্খলে বেঁধে রাখতেই চেয়েছেন। সেই জন্যই তিনি প্রত্য...

Spirituality, Devotion & VedantaNature, River & Seasonsসুন্দরবন
Read